সিঙ্গার (Singer): সেলাই মেশিন থেকে বিশ্বখ্যাত ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ড—ইতিহাস, মালিকানা ও বাংলাদেশের যাত্রা

 



| প্রারম্ভিকা

বাংলাদেশে গৃহস্থালির ইলেকট্রনিক্স পণ্যের কথা উঠলে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম সবার আগে আসে, তার মধ্যে সিঙ্গার (Singer) অন্যতম। একসময় সেলাই মেশিনের জন্য বিখ্যাত এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেনসহ নানা ধরনের গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি তৈরি ও বাজারজাত করছে। 


কিন্তু সিঙ্গার আসলে কোন দেশের প্রতিষ্ঠান? এর প্রতিষ্ঠাতা কে? বর্তমানে এর মালিক কে? বাংলাদেশে কীভাবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল? চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।


| সিঙ্গার কোন দেশের প্রতিষ্ঠান?

সিঙ্গারের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে (United States)। ১৮৫১ সালে মার্কিন উদ্ভাবক Isaac Merritt Singer তাঁর উন্নত নকশার সেলাই মেশিনের পেটেন্ট গ্রহণ করেন এবং I. M. Singer & Company প্রতিষ্ঠা করেন। এই ঘটনাকেই আধুনিক সিঙ্গার কোম্পানির সূচনা হিসেবে ধরা হয়।


| প্রতিষ্ঠাতা কে?

সিঙ্গারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আইজ্যাক মেরিট সিঙ্গার (Isaac Merritt Singer)। তিনি সেলাই মেশিনের মূল উদ্ভাবক না হলেও এর নকশায় যুগান্তকারী উন্নতি এনে এমন একটি ব্যবহারবান্ধব মেশিন তৈরি করেন, যা বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর উদ্যোগেই সিঙ্গার দ্রুত একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।


| বিশ্বের প্রথম বহুজাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি

১৮৭৬ সালে স্কটল্যান্ডে কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে সিঙ্গার বিশ্বের প্রথম দিকের বহুজাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে তাদের উৎপাদন ও বিক্রয় কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে।


| বাংলাদেশে সিঙ্গারের যাত্রা

বাংলাদেশে সিঙ্গারের ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরোনো।

১৯০৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশে সিঙ্গারের কার্যক্রম শুরু হয়।

১৯২০ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি বিক্রয়কেন্দ্র চালু হয়।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এটি পূর্ব পাকিস্তানে সিঙ্গার পাকিস্তানের শাখা হিসেবে পরিচালিত হয়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে Singer Bangladesh Limited বাংলাদেশে একটি নিবন্ধিত কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।


| বর্তমানে সিঙ্গার বাংলাদেশের মালিক কে?

অনেকেই মনে করেন সিঙ্গার এখনও একটি মার্কিন কোম্পানি। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। বর্তমানে Singer Bangladesh Limited-এর প্রধান নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তুরস্কের Arçelik A.Ş.-এর হাতে। Arçelik হলো তুরস্কের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী Koç Holding-এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। 


২০১৯ সালে Arçelik সিঙ্গার বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারিত্ব অধিগ্রহণ করে। কোম্পানির বাকি শেয়ার ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে লেনদেন হয়।


| বর্তমানে সিঙ্গার বাংলাদেশ কী কী পণ্য তৈরি ও বিক্রি করে?

বর্তমানে সিঙ্গার বাংলাদেশ শুধু সেলাই মেশিনের কোম্পানি নয়। তারা উৎপাদন ও বিপণন করে—

• রেফ্রিজারেটর

• টেলিভিশন

• এয়ার কন্ডিশনার

• ওয়াশিং মেশিন

• মাইক্রোওয়েভ ওভেন

• সেলাই মেশিন

• ছোট গৃহস্থালি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি

• বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের হোম অ্যাপ্লায়েন্স

বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব উৎপাদন কারখানাও রয়েছে।


| সিঙ্গার বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবসার অবস্থা

সিঙ্গার এখনও বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ড। দেশজুড়ে শত শত শোরুম, ডিলার নেটওয়ার্ক, সার্ভিস সেন্টার এবং অনলাইন বিক্রয়ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা ব্যবসা পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।


তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং আর্থিক চাপের কারণে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা আগের তুলনায় চাপের মুখে পড়েছে। তবুও সিঙ্গার এখনও দেশের অন্যতম সুপরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।


| সিঙ্গারের সাফল্যের মূল কারণ

• ১৭৫ বছরেরও বেশি বৈশ্বিক ঐতিহ্য

• শতাধিক বছরের বাংলাদেশে উপস্থিতি

• উন্নত বিক্রয়োত্তর সেবা

• দেশব্যাপী বিস্তৃত বিক্রয় নেটওয়ার্ক

• কিস্তিতে পণ্য কেনার সুবিধা

• আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন উৎপাদন


| উপসংহার

সিঙ্গারের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি সেলাই মেশিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিশ্বের অন্যতম পরিচিত হোম অ্যাপ্লায়েন্স ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। 


বর্তমানে তুরস্কের Arçelik-এর মালিকানায় পরিচালিত হলেও সিঙ্গার এখনও বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ড হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রযুক্তি, দেশীয় উৎপাদন এবং উন্নত সেবার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।



No comments

Powered by Blogger.