খাবার পানিতে অতিরিক্ত আয়রন: শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর? লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার
বাংলাদেশের অনেক এলাকায় টিউবওয়েল, নলকূপ বা মোটরের পানিতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি আয়রন (Iron) থাকে। এই পানি সাধারণত হালকা হলুদ বা লালচে রঙের হতে পারে এবং ধাতব স্বাদ অনুভূত হয়। অনেকেই প্রশ্ন করেন—এই পানি নিয়মিত পান করলে কি শরীরের ক্ষতি হয়?
এর উত্তর হলো—সাধারণভাবে পানিতে অতিরিক্ত আয়রন থাকলে তা সব মানুষের জন্য গুরুতর ক্ষতিকর নাও হতে পারে, তবে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত আয়রনযুক্ত পানি পান করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের শরীরে আয়রন জমার প্রবণতা রয়েছে বা লিভারের কিছু রোগ আছে, তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
✓ অতিরিক্ত আয়রনযুক্ত পানির লক্ষণ
পানির রং হলুদ, কমলা বা লালচে হয়ে যাওয়া।
পানিতে ধাতব (Metallic) স্বাদ।
রান্নার পর খাবারের রং পরিবর্তন হওয়া।
বালতি, সিঙ্ক, টয়লেট বা কাপড়ে লালচে-বাদামী দাগ পড়া।
চা বা কফির স্বাদ পরিবর্তন হওয়া।
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত আয়রনযুক্ত পানি পান করলে সম্ভাব্য প্রভাব
সব মানুষের ক্ষেত্রে একই রকম সমস্যা হয় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে—
পেটে অস্বস্তি, বমিভাব বা কোষ্ঠকাঠিন্য।
কিছু মানুষের ডায়রিয়াও হতে পারে।
মুখে ধাতব স্বাদ লেগে থাকা।
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত আয়রন শরীরে জমলে লিভার, হৃদ্যন্ত্র বা অগ্ন্যাশয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে (বিশেষত যাদের আয়রন জমার রোগ রয়েছে)।
কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আয়রনসমৃদ্ধ পরিবেশে বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে, ফলে পানির মান খারাপ হতে পারে।
✓ কারা বেশি ঝুঁকিতে?
যাদের বংশগতভাবে শরীরে আয়রন জমার প্রবণতা আছে।
দীর্ঘমেয়াদি লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত আয়রন ট্যাবলেট খাচ্ছেন এমন ব্যক্তি।
✓ কীভাবে বুঝবেন পানিতে
আয়রন বেশি?
পানি কিছুক্ষণ রেখে দিলে নিচে লালচে-বাদামী আস্তরণ জমে।
কাপড় ধোয়ার পর হলুদ বা বাদামী দাগ পড়ে।
পানির স্বাদ ধাতব লাগে।
পরীক্ষাগারে পানির নমুনা পরীক্ষা করলে আয়রনের মাত্রা জানা যায়।
✓ প্রতিকার
সম্ভব হলে আয়রন রিমুভাল (Iron Removal) ফিল্টার ব্যবহার করুন।
বছরে অন্তত একবার পানির মান পরীক্ষা করুন।
পানির ট্যাংক ও পাইপ নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।
যদি পানিতে আয়রনের সঙ্গে আর্সেনিক বা ম্যাঙ্গানিজও থাকে, তাহলে উপযুক্ত পরিশোধন ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
পরিবারের কারও দীর্ঘদিন পেটের সমস্যা, লিভারের সমস্যা বা অতিরিক্ত আয়রনের সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করান।
✓ নিরাপদ আয়রনের মাত্রা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পানীয় পানিতে আয়রনের জন্য কঠোর স্বাস্থ্যভিত্তিক সীমা নির্ধারণ করেনি, কারণ সাধারণ মাত্রায় এটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে না। তবে ০.৩ মিলিগ্রাম/লিটার (mg/L)-এর বেশি আয়রন থাকলে পানির রং, স্বাদ ও গন্ধের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা ব্যবহারকারীর জন্য বিরক্তিকর হতে পারে।
উপসংহার
অতিরিক্ত আয়রনযুক্ত পানি সবসময় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি না করলেও দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই পানির রং, স্বাদ বা দাগের মতো লক্ষণ দেখা গেলে পানির পরীক্ষা করানো এবং প্রয়োজনে আয়রন অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে ভালো। নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি সুস্থ জীবনের অন্যতম প্রধান শর্ত।


No comments